
ছবি: সংগৃহীত
গতকালই হাসপাতাল থেকে মাকে নিয়ে ফিরেছে দিশা। আজ একটু বেরিয়েছে। ইস্ট রিভারের গা ঘেঁষে রেলিং এ হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। কিছুটা উদভ্রান্ত, ক্লান্ত। দূরে এক ঠায় তাকিয়ে থাকে। চোখ দুটো যেনো কিছুই দেখছে না। ফোন বেজেই চলে কিছুই শোনে না সে। সম্মুখে গোটা ম্যানহাটান, সরব। প্রাণের চাঞ্চল্য। লড়াই জীবনের। থেমে নেই কিছু চলছে তো চলছেই, আকাশে ও পাতালে। দিশাও চলতে চায় সম্মুখে ভেঙেচুরে সব বাঁধ। কিন্তু ওর হৃদয় ভাঙ্গে যখন থমকে যায় সব। ভেতরটা কুঁকড়ে আসে। খান খান হয়ে যায়। এমন দানব বাবা না যেন হয় কারো। মা শুরু থেকেই মুখে তালা দিয়েছিল, সমাজের চাপে লাথি গুঁতা খেয়েও কামড়ে ছিল সংসার। মেয়ে মার খাচ্ছে দেখেও রা নেই মুখে। রা করলেই বিপদ নিস্তার নেই তারও। স্বামীর পাষ- রূপ তার চেয়ে বেশি কে জানে। ঘর ছেড়ে পালাবে বহুবার ভেবেছে, ভাবনাই সই পারেনি মুক্ত হতে। মুরুব্বিরা বলেই চলেছে সংসার করা এত সহজ না। মেয়ে মানুষের জীবনে সংসারই আসল ঠিকানা!
দিশার বাবা চঞ্চল কুলি মজুরের কাজ করে কৃষ্ণপুর বাজারে। মজিদ মেম্বার ঠেসে বাজার করছে আজ। পিছে পিছে চাঙ্গারি মাথায় চঞ্চল। মেম্বারের বাজার টানলে সে ৫০ টাকা পায়। অন্যরা তো ৫-১০ টাকার বেশি দেয় না। সব যেন ফকিন্নির পুত। কিন্তু মেম্বারের কাড়ি কাড়ি টাকা। অনেকে তাকে চোরা মেম্বারও বলে। সামনাসামনি বলে না। বড় গুন্ডাবাহিনী আছে মেম্বারের। যে দল ক্ষমতায় যায় মেম্বার সেই দলই করে। হিসাব সোজা। চঞ্চল এলাকার সব খবর পাচার করে মেম্বারের কানে। যার জন্য মেম্বার তাকে সাত হাজার টাকার মোবাইল কিনে দিয়েছে। বাজার করা শেষ। বিদায় কালে চঞ্চল কাচুমাচু হয়ে বলে, কাকা যদি একটু পল্লব ভাইরে বইলা দিতেন - তাইলে আমরিকার লটারি ধরতাম। ওই ছাগল সুখে থাকতে ভূতে কিলায় ? আমেরিকা যাইয়া করবি কি গাধা? চঞ্চল দমে না,কাকা লটারি ধরলেই কি পামু? যদি একবার কইয়া দেন। আচ্ছা যাইয়া আমার কথা কবি, টাকা পয়সা যা লাগবো কইবি আমি দিমু। চঞ্চলের মুখে ভুবন ভোলানো হাসি। পল্লব, মেম্বার এর একমাত্র ছেলে। উপজেলায় ফোন ফেক্স গ্রাফিক্স প্রিন্টং এর ব্যবসা। চঞ্চল ভিড় ঠেলে দোকানে ঢুকে যায়। ভাইজান কাকায় পাঠাইছে। সবুর কর ,পল্লব ধমক দেয় - দেহস না মাইসের লাইন।
ক ‘মাস পর চিঠি আসে চঞ্চলের নামে। ডিভি লটারি জিতে যায় সে। পৃথিবী যেন ওলটপালট হয়ে যায়,কি আচানক কা-! অজানা স্বপ্নে বিভোর সে, ভেবে কুল কিনারা পায় না। কিভাবে যাবে কি করবে কি খাবে ওখানে,সব অজানা। যে কিনা উপজেলা শহর ছাড়া কিছু দেখে নাই তার জন্য আমরিকা! এখন তো ভয় পাচ্ছে। শেষে মেম্বার কাকা আর পল্লব ভাইজানই ভরসা। জমি জিরাত যা কিছু আছে সব লিখে নেয় মেম্বার। পরিবর্তে সুটকেস কেনা থেকে টিকিট করা সব হয়ে যায়। মেম্বারের চাচাতো শালা থাকে ব্রুকলিনের ইউটিকা এভিনিউতে। ঠিক হয় ওখানেই থাকবে অন্তত ছয় মাস।
আমেরিকা আসার পরপরই কাজ পেয়ে যায় চঞ্চল। মেম্বারের শালার রেস্টুরেন্টে, কিচেন বয়। সাবওয়ে ধরে কাজে আসে যায় সে। মাসখানেক অনেক ভুলভাল হলেও এখন ঠিকঠাক যেতে আসতে পারে। তিন মাস হলো, দিশার মা ঘরের বাহির হয়নি একদিনও। দিশাকে গ্রেড ফাইভ এ ভর্তি করা হয়েছে। সে বাড়িওলার মেয়ের সাথে স্কুলে যাতায়াত করে। স্কুলে দিনকে দিন ওর ভালোলাগা বাড়তে থাকে। ইংরেজি ভাষাটাও একটু শিখে ফেলেছে। ল্যাঙ্গুয়েজের জন্য আফটার স্কুল প্রোগ্রাম করছে। এখানে স্কুলের টিচাররা মারধর করে না। ও যে অনেক কিছু পারছে না বা পিছিয়ে আছে তাতে কেউ হাসাহাসি করে না বরং সবাই হেল্প করে আদর করে কেয়ার করে।
দিশার মা বেশ কিছুদিন হলো রান্নার কাজ করে বাড়িওয়ালাদের। তাতে কিছু টাকা পায়। চঞ্চল এখন রেস্টুরেন্টের মেইন শেভ না এলে টুকটাক রান্নাও করে ফেলে। দু’ চারজন বন্ধু হয়েছে চঞ্চলের, তারাও এসেছে লটারি জিতে বা খানাখন্দ পাড়ি দিয়ে। এদের কারো শিক্ষা দীক্ষা তেমন নেই। নিজেরা এক হলেই গালগল্প চলে, অন্যথায় অন্যদের সাথে দু’চারটা ভুলভাল ইংরেজি শব্দের মিশেলে ইশারা ইঙ্গিতে কাজ সারতে হয় এদের। দিশা বাবা কে লুকিয়ে মাকে একদিন বাঙালি গ্রোসারিতে নিয়ে যায়। এ যেন গুহা থেকে বের হয়ে পৃথিবী দেখা। ফিরে এসে ওর মা খুশিতে এটা ওটা ভালো-মন্দ রাধে স্বামী ফিরে এলে খেতে দেয়। পাশে বসে খুশিতে অনর্গল বলে যায় তার ভ্রমণ কাহিনী। পরক্ষণেই বুঝতে পারে স্বামী এসব শুনে খুশি হচ্ছে না। চেঁচিয়ে ওঠে- এরপরে যাই করবি আমারে জিগাইবি। দিশাকেও শাসানো হয়, পাঙ্খা গজাইছে না?ম াদবরি আমার পছন্দ না! দিশা নিরবে কাঁদে নিজের জন্য যত না মার জন্য তত বেশি ।বুঝ হওয়ার পর থেকে মাকে কতবার মার খেতে দেখেছে ! দেখে ফেললেও বিপদ, তাকেও ধমকানো হয় তীব্র ভাষায় - কেউ যদি জানে এসব, মা আর তুই আস্ত থাকবি না ।
লেখক: অভিনেতা।