
ছবি: সংগৃহীত
পূর্ব প্রকাশের পর
স্কুলের সময়টা দিশার স্বর্গময় মনে হয় । দু‘ চারজন যে তাকে বুলিং করেনি তা না কিন্তু টিচাররা তাকে সান্ত¡না দিয়েছে এবং যে করেছে তাকে শুধরে দিয়েছে সঙ্গে সঙ্গে ।কি সুন্দর বিচার বিবেচনা! বাংলাদেশের এক অচিন গেরাম থেকে এসেও সে যেন সবার সমকক্ষ ।কোনো ভাগাভাগি নাই ।না রঙের না ধর্মের না জাতের না নারী-পুরুষে বিভাজন !অন্যদিকে ঘরে তার নরক বাস । এর শেষ কোথায় ?দিশা এখন প্রতিবাদ করতে চায়। ও কলেজ শুরু করেছে ,বারুক কলেজ । যা পড়তে চেয়েছিল বাবার ধাতানিতে পড়তে হচ্ছে অন্য কিছু । পড়তে চেয়েছিল ভাষা সাহিত্য নিয়ে কিন্তু পড়তে হচ্ছে ফাইনেন্স। মূর্খ বাবা নাকি জেনে এসেছে যে, ইংরেজি পড়ে বেশি টাকা কামাতে পারবেনা ।তাই ওটা বাদ ।টাকার লোভ!
টাকা পাঠিয়ে এই সাত বছরেই মেম্বার এর মত বিল্ডিং বানিয়েছে দেশে ।অথচ বউটাকে ব্রুক্লিনের সুন্দর বিল্ডিং গুলিও দেখায়নি কখনো ।মেয়ে মানুষ ঘরে থাকবে চুলা গুতাবে ইত্যাদি ইত্যাদি ।দিশার মাও এসবে যেন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে । দিশা যখন মাকে বলে এটা কেমন জীবন ? মা বলে - মানুষটা কত খাটাখাটনি করে ।আমারে মারধর করলেও আরেকটা বিয়া তো করে নাই । বাহ্ কি সান্তনা নিজের জন্য ! দিশা বলে - আর কয়টা বছর মা, ব্যাচেলার শেষ করে তোমারে আগে মুক্ত করব । বাবা হইছে তো কি হইছে ? তুমি জানো এখানে গায়ে হাত তোলার শাস্তি কি ? তোমারে যে মারে অপমান করে এর শাস্তি কি তুমি জানো ? তুমি বা আমি যদি ৯১১ কল করি পুলিশ এসে বেঁধে নিয়ে যাবে ।সোজা জেল । মা বলে কস কি ?এসব কথা মুখে তুলবি না !
দিশা পার্ট টাইম ডানকিনে কাজ করে। বাবার হাত থেকে হাত খরচ পায় না ।মা লুকিয়ে লুকিয়ে কিছু দেয় ।মা বলে - সৎ রোজগার করবি সৎ পথে চলবি ।বাপের অভ্যাস যেন না পাস ।তোর বাপ এখনো চুরি করে ।রেস্টুরেন্টের বাজার করে যখন তখন টাকা সরায় ।কি নিমক হারাম , বাড়িওয়ালা আশ্রয় দিল চাকরি দিল আর হেয় কি করে দেখ । দিশা মাকে বলে তুমি বাড়িওয়ালারে কও ।মা বলে, হেরা জানে বুঝে যেকোনো সময় বার কইরা দিব ।নতুন লোক খুজতাছে। তুই যেন আবার কিছু কইস না বাবারে ।দিশা আর কি বলবে ? কিঞ্চিত এদিক সেদিক হলে মা সুদ্ধ ফল ভোগ করে তার । ওর জীবনে বাঁধা ছাড়া তেমন কিছু পায়নি, স্কুলের ক্লাস পার্টিতে নেচেছিল তাই মার খেতে হয়েছে ,ওসব নাকি নষ্ট মেয়েরা করে । পিকচার ডে-এর ছবি দেখে বাবা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে বলেছে এসব কাউলাগো লগে মিশবি না । দিশা ভাবে একে কে বোঝাবে যে আমরা এশিয়ানরাও কালো বা কাউলা । ধর্ম নিয়েও দিশা দিশাহারা। ওকে যেভাবে ধর্ম-কর্ম করতে বলা হয় আর অন্যদিকে যেভাবে গালাগাল করা হয় অন্য ধর্মকে তাতে ওর ঘোর আপত্তি ।কই স্কুলে তো এসব নিয়ে কোনো চাপাচাপি নেই একে অপরকে সম্মান করাটাই শেখানো হয়। শেখানো হয় সব মানুষই সমান ।
সেদিন অচেতন হয়ে ঘুমাচ্ছিল দিশা ।সেমিস্টার ফাইনাল দিয়ে রাত জেগেছে টানা কদিন ।মাঝরাতে হঠাৎ মার আর্তচিৎকারে ঘুম ভাঙ্গে । ও দৌড়ে যায় ।দেখে মায়ের ডান গাল ও কানের পাশ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে । গ্লাসের ভাঙ্গা অংশ গেঁথে আছে ওখানে । দিশা গলা ফাটিয়ে বাঁচাও বলে চিৎকার দেয়।চুরির দায়ে চাকরি গেছে চঞ্চলের। ঘরে ফিরে বউকে বলে । আগেই মানা করছিলাম এগুলা ছাড়েন । বউয়ের কথায় আগুন হয়ে যায় - মাগী মানুষ তুই কি বুঝস ? আমারে জ্ঞান দেশ , বলেই লাথি মারে খাবারে । আর বউকে চুলের মুঠি ধরে হেঁচকা টান মেরে ছুড়ে দেয় ।তাতেই এমন রক্তারক্তি। দিশাকেও ছাড়ে না চেঁচাবি না , বলে চেপে ধরে - যেমন মা তেমন ছাও । বলে পেটাতে থাকে ।ততক্ষণে বাড়িওয়ালা এসে দরজা খুলতে বলে ।রাস্তার উল্টোদিকের বাড়িগুলোয় বাতি জ্বলে যায়, অ্যাম্বুলেন্স পুলিশ সব এসে যায়। আশেপাশে কেউ ৯১১ কল দিয়েছে ।পুলিশ ঢুকে পড়ে । মা চিৎকার করে দিশাকে বলে - পুলিশরে ক কিছু হয় নাই । হের কোন দোষ নাই বেবাক দোষ আমার । দিশা আরও জোরে ধমকায় মাকে আমি সত্য বলব , তুমিও বলবা ।আমারে তুমি এতদিন যা শিখাইছো। দিশার মাকে অ্যাম্বুলেন্স তোলা হয় ॥ চঞ্চলকে হ্যান্ডকাফ লাগানো হয় ।
তারপর অনেক সময় গড়ায়।
যেতে যেতে কত রাত যায় দিন যায় । ইস্ট রিভার আর হাডসনের জল ঘোলা থেকে স্বচ্ছ হয় আবার ঘোলা হয় আবার হয় স্বচ্ছ ।রোদে জোছনায় জলে চিক চিক করে।
দিশার মন আজ আনন্দে দিশেহারা । ডাক্তার আজ বলেছে ও মা হতে চলেছে।ও স্বামীর হাত ধরে আজ হাঁটছে ঠিক সেখানটায় যেখানটায় অনেকদিন আগে এসেছিল অসহায় উদভ্রান্ত হয়ে মাকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে রেখে। ওর স্বামীর নাম হান্সি। সাউথ আফ্রিকান, কালো । দুজনে শিক্ষকতা করে একই স্কুলে । এখানেই পরিচয় সখ্য ও পরিণয় । হান্সির সাথে ওর ধর্মের মিল নেই রঙের মিল নেই জাতের মিল নেই সাংস্কৃতিক মিল নেই । যা কিছু আছে মনুষত্বের মিল । দিশার ধর্ম কর্মেও এক প্রকার অনীহা । ওর কাছে ধর্ম জন্মসূত্রে পাওয়া একটা কিছু যা কিনা অর্জনের কিছু নেই। অন্যদিকে হান্সি অনেকটাই ধর্মভীরু । দিশা ফাইন্যান্স ছেড়ে ভাষা নিয়েই পড়েছিল শেষে ।
ক‘বছর হল মাকে আরেকটা বিয়ে দিয়েছে । উনি স্বামীর সাথে লং আইল্যান্ডে থাকেন । ভদ্রলোকের এটা সেকেন্ড ম্যারেজ । খাবারের বিজনেস আছে ওনার । বাংলাদেশে থাকতে কলেজের প্রভাসক ছিলেন । ওনার ছেলে আর মেয়ে এখন অন্য শহরে থাকেন। মেয়েটা দিশার কলেজ মেট ছিল ।ছেলেমেয়েরা বাবার বিয়েতে এসেছিল , অনেক মজা করে ফিরেছে । দিশাও করেছে বাঁধভাঙ্গা আনন্দ । এই তো সেদিন মাকে ঠাট্টা করে বলেছে- শেষমেষ তুমি একটা মানুষকে বিয়ে করতে পেরেছ ।
চঞ্চল জেল খাটার পর রিহ্যেবে ছিল অনেক দিন । ওখানে এক বাঙালি মনো চিকিৎসক ওকে কাউন্সিলিং করত ।এতদিনে ও বুঝেছে মানুষ আর অমানুষের ভেদ !একদিন সে ফিরে আসে ব্রুকলিনের সেই বাড়িতে । কাউকে পায় না ।মেয়ে আর স্ত্রীর কথা সব শোনে বাড়িওলার মুখে ।শুনে কোন কথা বলে না ।কাঁদে । মুখ নামিয়ে ফিরে যেতে উদ্ধত হয় আবার ঘুরে তাকায় ।বলে - অগ ঠিকানা গুলান জানলে আমারে একটু দিবেন , আমি খালি একবার মাফ চাইতে যামু ।
দিশা আর হান্সি মাকে প্রেগনেন্সির সুখবরটা দিতে যাচ্ছে লং আইল্যান্ডে। ড্রাইভ করছে হানসি। দিশা বাইরে তাকিয়ে চাঁদাকাশ দেখছে । এমনি সময় একবার বাবার কথাও কি মনে হয় দিশার?! লেখক: অভিনেতা।